নিষিদ্ধদের ছকে সংঘর্ষ, ভাঙচুর

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা কয়েক দিন ধরে সড়ক দখল করে আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারে পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলনে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া রাজধানীর পল্লবী ও গাজীপুরে পুলিশ বক্সে আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশও চড়াও হয় বিক্ষোভকারীদের ওপর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল, জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। গতকাল রবিবার সকাল থেকে এসব এলাকায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির কার্যক্রমে জড়িত থাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৩০ নেতাকর্মীকে আটক করে আইন-শঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে গতকাল পর্যন্ত ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আজ সোমবার গাজীপুর ও মিরপুর ও সাভারে শ্রমিকরা আবারও আন্দোলনে নামলে গাজীপুরে ১৫০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া সাভার ও মিরপুরে কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ সকাল থেকেই রাজধানীর আশুলিয়া ও মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জেও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এমন সংকট নিরসনে আজ সকালে গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া বিকেলে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।
এর আগে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নির্ধারিত সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করা হয়। এ ছাড়া পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পোশাক শ্রমিকদের দাবি-দাওয়াকে সামনে রেখে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতা করার ছক আঁকেন তারা। এরই অংশ হিসেবে নানা জায়গায় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ৩০ আওয়ামী নেতাকর্মী আটক
পুলিশের গাড়িতে ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কারখানায় ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগসহ নানা সহিংস ঘটনায় উসকানি ও ইন্ধনদাতা হিসেবে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর নাম। ইতোমধ্যে মিরপুরে নাশকতা চালানোর সময় নিষিদ্ধ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের ৩০ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনকে আটক করে ডিবি পুলিশ।

তারা হলেন মো. কামাল গাজী, মো. ওলিউল্লাহ অনিক, আলিফ হোসেন ইমন, আরিফ আকন্দ, জায়েদ করিম জিয়াদ, মোয়াজ্জেম শাহরিয়া (নিয়াজ), জুবায়েদ ইসলাম জিসান, মো. নাহিদ হাসান, মাহিম মোল্লা, আরিফ ও রমজান সরকার। থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ১৯ জনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিরপুরে নাশকতা চেষ্টায় শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ২ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। তাদের আগের রাতেই গেরিলা-৭১ ও প্রজন্ম ৭১ নামে দুটি ওয়াটসআপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

মিরপুরে নাশকতায় ২০ ইন্ধনদাতা ও সমন্বয়ক
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, মিরপুরে নাশকতায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, মিরপুরের সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ, যুবলীগ নেতা তাজুল ইসলাম বাপ্পি ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের মামুন। এ ছাড়া ইন্ধনদাতা হিসেবে কাজ করেন পল্লবী থানা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক আলিফ মোল্লা, রূপনগর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ শুভ, পল্লবী থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জুনায়েদ হোসেন নাহিদ, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক বোতা খলিল, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল হাওলাদার, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল রানা, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম গাজী, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক লতিফ, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ যুগ্ম আহ্বায়ক শিমুল মোল্লা, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ মুন্সী, ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মীর রকি, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা আসলাম ও কাতল, ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছোট সেলিম, ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের রনি, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার। তাদের অনেকেই দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন।

ডিবি মিরপুর বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, আন্দোলনকে পুঁজি করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও নাশকতার চেষ্টা করছেন নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিরপুর ১০ ও এর আশপাশ এলাকায় অভিযানে গ্রেপ্তাররা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতা। তারা মাস্ক পরা ছিলেন। নাশকতার পর নিষিদ্ধ দলের মিছিল করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। মিরপুরের পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা মূলত এ নাশকতার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, সংঘর্ষ
গতকাল সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দখল করে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এ সময় তারা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেন। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করে। পরে পোশাক শ্রমিকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন। এসব ঘটনায় গোটা মিরপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আজ সোমবারও মিরপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

গাজীপুরে পুলিশ বক্সে আগুন, অবরোধ
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও গতকাল রবিবার বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আজ সোমবারও সেখানকার চিত্র একই। দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন তারা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশসহ ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনাবাড়ী থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক, বিভিন্ন পোশাক কারখানার ফটক, মৌচাক কাটার পুলিশ বক্স এবং কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরে পুলিশ, বিজিবি ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। সাভার-আশুলিয়ায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
আজ সকাল থেকেই সাভার ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। এ সময় তারা একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। গতকালও একই চিত্র ছিল। নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপ ও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে কাজ বন্ধ রেখে সড়কে অবস্থান নেন। পরে পৌনে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের সামনে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের সংহতি জানানোর আহ্বানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকরা সড়ক আটকে অবস্থান নিলে নিবৃত্ত করার চেষ্টাকালে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে শ্রমিকদের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।

পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকারি মজুরি বোর্ড গঠন
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি চূড়ান্ত করে এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। গতকাল এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক
সংকট কাটাতে আজ সকালে গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠক শেষ তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ হয়। তাদের জীবন মানের উন্নতি হয় এবং তাদের সব বিষয় বিবেচনা রেখে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে সে বিষয়টি (ন্যূনতম মজুরি) নির্ধারিত হয়। এটা উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারিত হবে।

পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিক ভাই-বোনদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আজ হয়তো তাদের প্রথম সভা হতে পারে বা সম্ভাব্য স্বল্প সময়ে তারা বসবেন। আলাপ-আলোচনা হবে। সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যথাশিগগির সম্ভব তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে ঘোষণা হতে পারে। সময়রেখা তিন বছর পূর্ণ হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। আশা করি, তারা সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করত পারবেন। আজও দুই শতাধিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা
পরিস্থিতি মোকাবেলায় আশুলিয়ায়, সাভার ও মিরপুরে প্রায় দুই শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২১০টির মতো পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরে ১৫০ পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সাভার-আশুলিয়া শিল্প অঞ্চলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০টির মতো কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আজ ১৫০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে।’

(অনলাইন ডেস্ক)