আর্তেমিস ২ অভিযানের শুরু থেকে নভোচারীদের হালনাগাদ তথ্য জানা অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। পুরোটা সময়জুড়ে টেক্সাসের মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন চার নভোচারী। এর মধ্যেই ৪০ মিনিটের জন্য মিশন কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ মডিউলগুলোয় নেমে আসবে নীরবতা। মহাকাশযান যাত্রীরা মহাজাগতিক নৈঃশব্দ্যে নিজেদের সঁপে দেবেন নিজেদের। অবশ্য এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু ছিল নেই। কারণ ক্রুরা যখন চাঁদের পেছনে যাবেন, তখন স্বাভাবিকভাবে রেডিও ও লেজার সিগন্যাল ব্লক হয়ে যাবে। ঠিক যেমন ফোনের সিগন্যাল আটকে যায় দেয়ালে। তেমনি অতিকায় চাঁদের কারণে মহাকাশযান ও পৃথিবীর মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হবে। এ সময় আর্তেমিস ২ ক্রুদের কাছ থেকে চন্দ্রপৃষ্টের সবচেয়ে কাছের দূরত্বে হবে ৪ হাজার ৬৬ মাইল, যা কিনা অ্যাপোলা ১৩ অভিযানের রেকর্ড অতিক্রম করবে। অর্থাৎ মানব ইতিহাসের যেকোনো মহাকাশযানের চেয়ে বেশি দূরত্বে অবস্থান করবেন নভোচারীরা। পৃথিবী থেকে চাঁদের সবচেয়ে দূরের অংশকেও সরাসরি চোখে দেখবেন, যা গত কয়েক দশকে সরাসরি দেখা হয়নি মানুষের। এ মুহূর্তগুলো মিশন কন্ট্রোলের তাৎক্ষণিক তদারকি ছাড়াই ঘটবে, তখন মহাকাশযান ক্রুদের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির মিশ্রণে পরিচালিত হবে। মহাজাগতিক অন্ধকারে মধ্য দিয়ে চলতে চলতে নভোচারীদের সঙ্গী হিসেবে থাকবে শুধু নিজস্ব চিন্তা ও অনুভূতি। নিঃশব্দ ও গভীর এক মুহূর্ত। এমন মহাজাগতিক নৈঃশব্দ্য কতজনের ভাগ্যে জোটে!
আর্তেমিসের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছেন, ‘যখন আমরা চাঁদের পেছনে যাব, সবার সঙ্গে যোগাযোগ হারাব, তখন এটাকে একটি সুযোগ হিসেবে নাও। প্রার্থনা করো, প্রত্যাশা করো, তোমার ভালো অনুভূতি পাঠাও যেন আমরা আবার যোগাযোগে ফিরতে পারি।’
এ ব্ল্যাকআউট অ্যাপোলা যুগের মিশনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যখন ক্রুরা চাঁদের পেছনে গিয়ে যোগাযোগ হারাত। অ্যাপোলা ১৩ এর দূরত্বের রেকর্ড ভাঙা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে মানুষের পুনরাবির্ভাবের প্রতীক এটি। ঘটনাটি মহাকাশে অনুসন্ধান ও আবিস্কারের দীর্ঘমেয়াদি চক্রের অংশ। নাসা এর মাধ্যমে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মিশন এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের জন্য সিস্টেম পরীক্ষা করছে।
বিশেষ করে অ্যাপোলা ১১ এর মাইকেল কলিন্সের বিরল এ নিসঙ্গতাকে অবগাহন স্মরণ করা যায়। ১৯৬৯ সালে যখন নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অ্যালড্রিন চাঁদের পৃষ্ঠে প্রথম পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন, কলিন্স কমান্ড মডিউলে ছিলেন একা। তার যান ছিল চাঁদের পেছনে। চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা ক্রু ও পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ ৪৮ মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের আত্মজীবনীতে মাইকেল কলিন্স লিখেছিলেন, ‘আমি সত্যিই একা’ এবং ‘পরিচিত জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নবোধ’ করছিলাম। তবে তিনি ভয় বা একাকিত্ব অনুভব করেননি।
পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, এ রেডিও নিস্তব্ধতা তাকে শান্তি দিয়েছে এবং মিশন কন্ট্রোলের ক্রমাগত নির্দেশনার বিরতি এনে দিয়েছে।
তবে পৃথিবী থেকে যারা মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, তাদের জন্য এ সময়টা চাপের। ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে সংকেত সংগ্রহ করে ক্রুদের অবস্থান নির্ণয় করে কর্নওয়ালের গুনহিলি আর্থ স্টেশনের একটি বিশাল অ্যান্টেনা। এ স্টেশনের চিফ টেকনোলজি অফিসার ম্যাট কসবি বলেন, ‘প্রথমবার আমরা মনুষ্যবাহী মহাকাশযান ট্র্যাক করছি। যখন ওরিয়ন চাঁদের পেছনে যাবে, আমরা একটু নার্ভাস হবো, আর যখন আবার দেখা যাবে, তখন খুব খুশি হবো। কারণ আমরা জানি তারা সবাই নিরাপদে আছেন।’
ভবিষ্যতে এ ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা হয়তো আর থাকবে না। ইএসএর মুনলাইট প্রোগ্রামের মতো উদ্যোগ সফল হলে, চাঁদের চারপাশে তৈরি হবে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। এর লক্ষ্য হলো ক্রুরা যাতে সব সময় পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে।
আর্তেমিসের ক্রুরা এ ৪০ মিনিট যে কর্মহীন থাকবেন বা শুধু চিন্তায় মশগুল থাকবেন এমন নয়। কারণ পুরো সময়টা মিশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা চাঁদ পর্যবেক্ষণ, ছবি তোলা ও চাঁদের ভূতত্ত্ব বিশ্লেষণ করবেন। আর সৌন্দর্য উপভোগ তো আছেই। আর পৃথিবীদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন মানেই হলো কিছু অভূতপূর্ব দৃশ্য মানবজাতিক সঙ্গে ভাগাভাগি। (অনলাইন ডেস্ক)



